‘রাজনৈতিক প্রভাবে বাণিজ্যিক সংগঠনে থাকে ক্ষয়ের ভয়’

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ১০:০০  

সাহাব উদ্দিন শিপন। বাণিজ্যিক স্পেসের সর্বোত্তম ব্যবহারের নান্দনিক নকশাকার। পেন্সিল স্কেচের কল্পনাকে বাস্তবে ফুটিয়ে তোলার কারিগর তথা ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। চাকরির অভিজ্ঞতা পুঁজি করে হয়ে ওঠেন উদ্যোক্তা। যুক্ত হন ই-কমার্স খাতে। ‘দিনরাত্রি’ থেকে ‘চিকিৎসা’ ই-কমার্স ব্যবসায়ী বৈচিত্রময়তা আনলেও পসার হয়নি সেই ভাবে। ই-ক্যাবের সিনিয়র সহ সভাপতির পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই’র জেনারেল বডি মেম্বার এবং এফবিসিসিআইয়ের ই-কমার্স স্ট্যান্ডিং কমিটির কো-চেয়ারম্যান এবং আলোচিত ই-ভ্যালি’র স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সবক্ষেত্রেই নীতিমালা প্রণয়ন ও উদ্ভূত জটিলতায় সামনের কাতারে ছিলেন। নিজের ব্যবসায় একের পর এক হোঁচট খেয়েছেন। আবার উঠেও দাঁড়িয়েছেন। তবে সংগঠনকে দিয়েছেন উজাড় করে। ছাত্র-জনতা অভ্যূত্থানে নতুন বাংলাদেশ-এ অতীত-ভবিষ্যতের মেলবন্ধনে বর্তমানকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ও মাইলফলক বাঁক হিসেবে দেখছেন তিনি। ব্যক্তি জীবনে মিশুক ও দুই সন্তানের এই জনক ডিজিবাংলাটেক নির্বাহী সম্পাদক ইমদাদুল হককে একান্ত আলাপচারিতায় জানিয়েছেন ক্যারিয়ারে কিছু কথা।

ডিবিটেক: আপনি তো একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। করতেন চাকরি। উদ্যোক্তা হলেন কীভাবে?
সাউশি: হ্যাঁ, আমি এসেন্ট গ্রুপে প্রায় একযুগ চাকরি করেছি । কিন্তু ২০০৮ সাল থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখি এবং ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ শুরু করি। এক পর্যায়ে ২০১১ সালে পুরোপুরি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পথচলা শুরু করি। গড়ে তুলি হাউজ ডি আর্ক। তখনই ওয়েব পেজের মাধ্যমে এই ইন্টেরিয়র ও অর্কিটেকচারাল কোম্পানির গ্রাহক হান্টিং শুরু করি। মূলত, আমি সব সময়ই এমন কিছু করতে চেয়েছি, যেখানে আমি আমার সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারি।

ডিবিটেক: কাদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়া ভালো আর কাদের জন্য চাকরি জীবন বেছে নেওয়া উচিত?
সাউশি
: চাকরি না উদ্যোক্তা? আসলে এটি পুরোপুরি ব্যক্তিগত পছন্দের উপর নির্ভর করে। যাদের মধ্যে নতুন কিছু তৈরি করার, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা আছে, তাদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়া সঠিক। তবে, চাকরিতে একজন ব্যক্তি স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা খুঁজে পেতে পারেন, বিশেষ করে যদি তিনি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে এবং একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন তার জন্য চাকরি ভালো । আমি বলব, উভয় পথই সফল হওয়ার সুযোগ দেয়, শুধু তা নির্ভর করে কার কি স্বপ্ন এবং লক্ষ্য।

ডিবিটেক: ই-কমার্স খাতে নাম লেখালেন কবে এবং কীভাবে? ই-কমার্স নিয়ে আপনার পরবর্তী গন্তব্য কী?
সাউশি
: আমি ই-কমার্স খাতে পা রাখি ২০১৪ সালে, যখন Dinratri.com প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করি, যা একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস হিসেবে কাজ করে। পরবর্তীতে, স্বাস্থ্যসেবা খাতে আরও গভীরভাবে কাজ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন ফার্মেসী Diabetes Store limited ও পরে Chikitsa নামে একটি হেলথকেয়ার সল্যুশন অ্যাপ চালু করি, যার মূল লক্ষ্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। Chikitsa অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবা প্রদান করা, যেখানে রোগীরা সঠিক ওষুধ পাবে এবং গ্রামীণ এলাকায় টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো। আমি চাই, প্রযুক্তির সাহায্যে গ্রামীণ জনগণের জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে, যাতে তারা উন্নত ও কার্যকরী সেবা পেতে পারে।

ডিবিটেক:: উদ্যোক্তা থেকে উদ্যোক্তা নেতা হলেন কখন?
সাউশি: সত্যি বলতে, আমি উদ্যোক্তা হতে চেয়েছি , কখনো উদ্যোক্তা নেতা হতে চাইনি। আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল কাজ করা এবং সেই কাজের মাধ্যমে সমাজে কিছু প্রভাব রাখা। যখন আমি দিনরাত্রি ডটকম প্রতিষ্ঠা করি, তখন ই-ক্যাবের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাই এবং সেই সময় থেকেই এই সংগঠনের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তখন থেকেই কাজের প্রতি আমার নিষ্ঠা আমাকে ই-ক্যাবে কিছু দায়িত্বে আনে। নেতৃত্বের পদে আসা আমার কাছে ছিল দায়িত্ব পালন করার একটি সুযোগ, যেটি আমি সর্বো”চ আন্তরিকতার সঙ্গে করার চেষ্টা করেছি।

ডিবিটেক:: ই-ক্যাবের সঙ্গে পথ চলা কেমন ছিলো?
সাউশি
: ই-ক্যাবের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা শুরু থেকেই দায়িত্বশীল ছিল। এবং ই-ক্যাবের সঙ্গে আমার স¤পর্ক একেবারে কাজ এবং দায়িত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আমি কখনো সংগঠনটিকে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করিনি, বরং দেশের ই-কমার্স খাতের উন্নয়নে কাজ করতে পেরেছি বলেই নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। ই-কমার্স পলিসি প্রণয়ন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ই-কমার্স ও সংশ্লিষ্ট যতগুলো পলিসি, নীতি প্রণয়ন হয়েছে বা চলমান আছে আমি প্রায় সবগুলোর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম।

ডিবিটেক:: অনেক নাটকীয়তার পর ই-ক্যাবে প্রশাসক বসল। আপনি শেষ পর্যন্ত ইসি-তে ছিলেন। আপনাদের অগ্রগামী আর এগুতে পারলো না কেন?
সাউশি: হ্যাঁ, অনেক চ্যালেঞ্জের পর ই-ক্যাবে প্রশাসক বসল । সেই পুরো প্রক্রিয়াটির অংশ হিসেবে আমি ইসির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত ছিলাম। আমাদের অনেক প্রচেষ্টা এবং কাজ ছিল সংগঠনটিকে সঠিক পথে ধরে রাখার জন্য। তবে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যেখানে প্রশাসক নিয়োগই ছিল একমাত্র আইনি পদক্ষেপ। অগ্রগামী একটা নির্বাচনী প্যানেল ছিল। ভবিষ্যতে আবারো হয়তো এই প্যানেল নিয়ে কেউ ইলেকশন করতে পারে।

ডিবিটেক:: ই-ক্যাব কি রাজনীতি না কুটনীতির শিকার?
সাউশি: ই-ক্যাবের উন্নয়নের পথচলায় কিছু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ দেখা দিলেও, এটি সংগঠনটির জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আমি মনে করি, এসব চ্যালেঞ্জ আমাদের আরও দৃঢ় ও সচেতন করেছে, যা ভবিষ্যতে সংগঠনকে শক্তিশালী হতে সহায়তা করবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মতো ই-ক্যাবও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত বাস্তবতাকে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, এবং ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও সফল হতে পারবে।

ডিবিটেক:: ব্যক্তিগত জীবনে ছবি তোলা ও ভ্রমণ প্রেমী ছিলেন। ছিলেন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। সেগুলোকে পাশে রেখে কীভাবে একজন উদ্যোক্তা হয়ে উঠলেন? ই-কমার্সে যুক্ত হলেন?
সাউশি: ছবি তোলা এবং ভ্রমণ করা সবসময় আমার শখের অংশ ছিল। কিন্তু আমি সব সময়ই কিছু সৃষ্টিশীল কাজ করতে চেয়েছি। ইন্টেরিয়র ডিজাইন ছিল সেই সৃজনশীলতার প্রথম ধাপ। পরে, আমার নিজস্ব ব্যবসা শুর“ করার সময়, ই-কমার্সের দিকে ধীরে ধীরে আগ্রহ জন্মায়। ই-কমার্স এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে প্রযুক্তি এবং সৃজনশীলতা একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারে, আর এটাই আমাকে ই-কমার্সে যুক্ত করেছে।

ডিবিটেক: দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বেশ কয়েকটি সংগঠন এখন। অনেক ভাগ বিভাগ। এই ভাগে বিগত সময়ে যুক্ত হয়েছে প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক শক্তি। বাণিজ্যিক সংগঠনকে এটা কতটা শক্তি জোগালো? না কি শক্তি ক্ষয় করেছে?
সাউশি: রাজনৈতিক প্রভাব দুই দিকেই কাজ করতে পারে। একদিকে, রাজনৈতিক শক্তি কোনো বাণিজ্যিক সংগঠনের শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে। যখন একটি সংগঠন সরকারের নীতিমালা বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে, তখন তারা অনেক সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে, যেমন নীতি-সংক্রান্ত সহায়তা, ব্যবসার প্রসার এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতার সুযোগ। এ ধরনের সহযোগিতা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য বড় পটভূমিতে উপকার বয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে, এই রাজনৈতিক শক্তি যদি অতি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তাহলে এটি শক্তি ক্ষয় করতে পারে। রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা হারিয়ে যেতে পারে। এতে করে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ঐক্য দুর্বল হতে পারে এবং নিজেদের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পাশাপাশি, ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ থাকা জরুরি, যেখানে রাজনীতির প্রভাবের চেয়ে দক্ষতা ও উদ্ভাবনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।

ডিবিটেক:: ছাত্র-জনতা অভ্যূত্থানে নতুন বাংলাদেশ-এ অতীত-ভবিষ্যতের মেলবন্ধনে বর্তমানে কোনো কোন বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করতে চান?
সাউশি:
নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়তে আমি বর্তমানে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সংস্কৃতির প্রসার, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, এবং সুশাসন ও স্বচ্ছ নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করতে চাই। তরুণদের জন্য যুগোপযোগী শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিশ্চিত করা, নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা একটি টেকসই ও শক্তিশালী ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারব। পাশাপাশি, সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সবার জন্য সমান সুযোগের নীতিমালা নিশ্চিত করা জরুরি।

ডিবিটেক: দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ায় আপনাকে ধন্যবাদ।
সাউশি: আপনাকে এবং ডিজিবাংলার পাঠকদের দীর্ঘ সময় ধরে আমার কথাগুলো পড়ার জন্য কৃতজ্ঞতা।